Inside BD Crime

Write Your Experience

‘ম্যানেজ’ করে রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ লেগুনা

 

বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজধানীর সড়কগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ লেগুনা। ভাড়াসহ সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় ঢাকায় লেগুনা-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো অভিযোগ জানানোর সুযোগও নেই। বেশ আগে সরকারিভাবে ঢাকার সড়ক থেকে লেগুনা তুলে দেওয়ার ঘোষণা এসেছিল। কিন্তু সেই ঘোষণা বেশি দিন কার্যকর থাকেনি। ভাড়াসহ সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় লেগুনা-সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ জানানোর সুযোগ নেই যাত্রীদের। যার কারণে যাত্রীরা নিরুপায় হয়ে এই যানবাহন ব্যবহার করছে।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের মূলসড়কে চলাচলরত লেগুনা চালক ও হেলপাররা অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। লাইসেন্সবিহীন বেপরোয়া চালকদের হাতে স্টিয়ারিং জেনেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন সাধারণ মানুষ। যাত্রীদের অভিযোগ, যথাসময়ে বাস না পাওয়ায় এবং সংশ্লিষ্ট রুটে বাসের সার্ভিস না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এ সব লেগুনায় চলাচল করছে। যার কারণে লেগুনা চালকদের হাতে অনেকটা জিম্মি তারা।

রাজধানীর, বাড্ডা, বাসাবো, ফকিরাপুল, মতিঝিল, মালিবাগ, গুলিস্তান, আদাবর, আসাদগেট, ফার্মগেট, শেরেবাংলা নগর, মিরপুর, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও উত্তরা, আজমপুর, আজিমপুর, লালবাগ, সেকশন, মিরপুর বেড়িবাঁধ, মোহাম্মাদপুরসহ বেশ কিছু এলাকায় ঘুরে দেখা যায় এ সব অবৈধ লেগুনা দেদারছে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ট্রাফিক পুলিশ অবৈধ লেগুনার জন্য আলাদা করে লেন বানিয়ে লেগুনা স্ট্যান্ড করে এবং গাড়ি চলাচলের রাস্তাটাকে ছোট করে ফেলে। ট্রাফিক পুলিশ এসব গাড়ি কম ধরে আর ধরলেও ছেড়ে দেয়। এলাকা ভিত্তিক কিছু রাজনৈতিক নেতা এ সব লেগুনা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে মিশে রাস্তায় চলাচল করিয়ে থাকেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পলাশী মোড়ে কথা হয় ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্টের সঙ্গে। ওই সার্জেন্ট জানান, বেড়িবাঁধ থেকে লালবাগ হয়ে যেসব লেগুনা চলাচল করে এসব লেগুনা ধরার মতো আমাদের ক্ষমতা নেই। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের উপরের স্যারেরা বলেন, এ সব লেগুনার মালিক বিভিন্ন এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও জনপ্রতিনিধিরা। এর সঙ্গে সরকারের দলীয় লোকজনও জড়িত রয়েছে বলে জানা যায়। আমরা ছোট চাকরি করি এজন্য এ সবের পেছনে লাগতে চাই না।

ছোট ছোট কিশোরদের দিয়ে এ সব লেগুনা চালনা করে আপনারা আইনগত ব্যবস্থা নেন না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে ওদের ধরে মালিককে জানাই, পরে আবার ছেড়ে দিতে হয় এজন্য এখন আর লেগুনা ধরি না। চাকরি জীবনের শুরু দিকে কয়েকদিন ধরেছি এখন আর ধরি না।

ফার্মেগেটের যাত্রী রবিন, আজিমপুরের যাত্রী নজরুল ও মিরপুর থেকে ইন্দিরা রোডের যাত্রী ইকবাল হোসেন বলেন, রাজধানীর বিভিন্নস্থানে চলাচল লেগুনা চালকদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। অনেকেরই নেই লাইসেন্স। এ লেগুনা চালকদের হাতে জিম্মি আমাদের মতো হাজার হাজার যাত্রী। লেগুনা কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের গলাকাটছে, নিচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া— যা দেখার কেউ নেই। গাড়ির চালকরা রাস্তায় যেমন খুশি তেমনই চলাচল করে। ট্রাফিক পুলিশ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ সব লেগুনার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন। আর এ ব্যয় মেটাতে লেগুনা মালিকরা যাত্রীদের কাছ থেকে অযৌক্তিকভাবে ভাড়া আদায় করেন। কোনো কারণ ছাড়াই রাজধানীতে লেগুনার ভাড়া বেড়েই চলেছে।

বিআরটিএ এর তথ্য মতে, কয়েক বছর আগে লেগুনাকে মিনিবাস গণ্য করে ভাড়া নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু পরে বিআরটিএ’র একটি মিটিং এ লেগুনাকে রুট পারমিট দেওয়া হয় না। এরপর থেকেই মেইন রোডে চলাচলের জন্য এই যানবাহনটিকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিআরটিএ জানায়, ভবিষ্যতে লেগুনা থাকবে না। এটি উঠে যাবে এই পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। সরকারিভাবে লেগুনাকে বলা হয়, ‘হিউম্যান হলার’ কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষ্য অনুযায়ী এটাকে বলে ‘লেগুনা’।

তাদের হিসেবে, শুধুমাত্র ঢাকায় লেগুনা আছে প্রায় ৫ হজারেরও বেশি। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও কয়েক গুণ।

লালবাগ-আজিমপুরে কথা হয় লেগুনার যাত্রী আবুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমার বাসা সেকশন। প্রায় দিন এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করি। মাঝে এই রোডে লেগুনা বন্ধ ছিল। ২০২২ সালের শুরুতে নতুন করে বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই রাস্তায় চলাচল করছে অবৈধ লেগুনা।

শুধু আজিমপুর নয়— মিরপুর, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়িসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবাধে এ সব অবৈধ যানগুলো চলাচল করছে। তাদের ক্ষেত্রে পুলিশের আইনি প্রক্রিয়া একটু কম দেখা গেছে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ১৭টি নির্দেশনা আসে। সেই নির্দেশনা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ওই নির্দেশনার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজধানীর মূল সড়ক ও রাজপথগুলোতে লেগুনা চলাচল বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হলো। সেই ঘোষণার পর বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবারো অবাধে চলাচল শুরু করেছে এ সব অবৈধ যানগুলো।

এ সব যানবাহন পরিচালনার কাজে যুক্তরা বেশির ভাগ শিশু-কিশোর ও যুবক বলা যায়, অধিকাংশ চালক ও হেলপার অপ্রাপ্তবয়স্ক। লেগুনা চালক ও হেলপারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। তারা বিভিন্ন রোডে মালিকের কথা মতো চলাচল করেন। এবং তাদের লাইনের কোনো ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা এ সব গাড়ি আটকিয়ে রাখেন না। যদি অন্য লাইনে বা রোডে তারা প্রবেশ করে তাহলে সেই জোনের ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা তাদের আটক করলে রাজনৈতিকভাবে ও প্রশাসনিক (পুলিশের) মাধ্যমে এ সব গাড়ি ও চালকদের ছাড়িয়ে নেওয়া হয়।

ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে কথা হয় ঢাকা মেট্রো-হ ১৪-১৪৫১ নম্বর এর লেগুনা চালক হিরোনের সঙ্গে। হিরোন বলেন, পুলিশে রাস্তায় আটক করলে আমরা মালিককে ফোনে ধরিয়ে দেই। এরপর মালিক তাদের সঙ্গে কি কথা বলে সেটা তো আমাদের জানা নেই।

মিরপুর টু মহাখালী এলাকার লেগুনা চালক নাছির বলেন, আমাদের রোড হলো মিরপুর থেকে মহাখালী পর্যন্ত। এর বাইরে চললে পুলিশে ধরে এজন্য এর বাইরে যাই না।

ফার্মগেট টু নিউমার্কেট রোডের লেগুনার মালিক আহমেদ চুন্নু হক বলেন, পুলিশের কাছ থেকে বিশেষভাবে এসব লেগুনার রুট পারমিট নেওয়া আছে। রুট পারমিট কীভাবে পেলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনাকে তো এ সব কথা বলতে পারবো না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশেরও অনেক লোক আমাদের ভাই ব্রাদার। আমাদের ভেতরের খবর আপনাকে বলবো কেন?

এ বিষয়ে ফার্মগেটের আনন্দ পরিবহনের মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফ খান বলেন, আমরা রাস্তায় নিয়ম মেনেই চলাচল করি। আপনাদের কোনো অভিযোগ থাকলে ট্রাফিক বিভাগ বা সিটি করপোরেশনকে বলেন। তা ছাড়া এই ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আমরা কথা বলতে চাই না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনসহ লেগুনায় প্রতিদিন অতিরিক্ত ভাড়া-নৈরাজ্যের অভিযোগ দেয় যাত্রীরা। দীর্ঘদিন ঢাকায় লেগুনা চললেও এটা কোনো নিয়মের মধ্যে আসেনি। অধিকাংশ চালকদের নেই লাইসেন্স। এই যানবাহন চলাচলের জন্য অনেক প্রভাবশালীরা যুক্ত রয়েছে যার কারণে সাধারণ যাত্রীরা এদের কাছে জিম্মি। যাত্রীদের ইচ্ছা থাকলেও এর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে না।

রাজধানীতে লেগুনার অবাধ চলাচল সম্পর্কে জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক প্রধান) মনিবুর রহমান ঢাকাপ্রকাশ’কে বলেন, আপনি যে সব লেগুনার কথা বলছেন সেগুলো কি নিয়মের মধ্যে আছে কি না। সেই সব বিষয়টি আগে দেখা দরকার। আর যেগুলো নিয়মের বাইরে চলছে সেগুলো আমরা দেখব। তিনি বলেন, তবে এ সব লেগুনার সঙ্গে আমাদের ট্রাফিক পুলিশের কোনো সর্ম্পক নেই।

মনিবুর রহমান বলেন, লেগুনার কিছু অনুমতি আছে। তবে তাদের মূল সড়কে চলাচলে নিষেধ করা আছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের অলিতে গলিতে তারা চলাচল করে। যাদের লাইসেন্স নেই তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তা ছাড়া এদের সঙ্গে আমাদের পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। আর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা জড়িত কি না সেটা আমাদের জানা নেই।

পুলিশের নাকের ডগায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনুমোদনহীন লেগুনা

অনুমোদন না থাকলেও রাজধানীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হিউম্যান হলার বা লেগুনা। ট্রাফিক পুলিশের নাকের ডগা দিয়েই রাজপথে বেপরোয়া রাজত্ব এই পরিবহনের। লেগুনার যেমন নেই বৈধ কাগজ, তেমনি এর চালকদেরও নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। ট্রাফিক পুলিশকে টাকা দিয়েই সবকিছু ম্যানেজ হচ্ছে বলে দাবি চালকদের।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সুপারেনটেনডিং ইঞ্জিনিয়ার (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল) কাজী মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনও ব্যবস্থা নেবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, লেগুনা তো অনুমোদিত না। এটা দেখার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। আপনার শাস্তি দেন।

ট্রাফিক (দক্ষিণ) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর মূল সড়কগুলোতে লেগুনা উঠলে আমরা ডাম্পিং করে দিই। কারণ সেগুলো কোনো অনুমোদিত গাড়ি না।  

লেগুনা চালক হাসানের স্বীকারোক্তিতেই উঠে এসেছে এই পরিবহনের নানা অনিয়মের কথা। আর অবৈধ পরিবহন চোখের সামনে দিয়ে কেন চলছে? এ প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক জবাব নেই ট্রাফিক পুলিশের কাছে।

চালক হাসান বলেন, গাড়ির কাগজপত্র তো সারাজীবনই ফেল! পুলিশ ধরলে তাদেরকে নাস্তাপানির জন্য এক থেকে ১৫০ টাকা দিলেই ছেড়ে দেয়।

ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্য বলেন, শুধু লেগুনা না, অবৈধ সব ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধেই আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

দুরন্ত সময়কে আয়ত্তে আনতে নগরবাসী প্রতিনিয়তই ব্যবহার করছেন ঝুঁকিপূর্ণ এই যানবাহন। তবে চলতে হলে দরকার সঠিক ব্যবস্থাপনা।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলেন, যেখানে সেখানে লেগুনা না থামানো এবং না উঠার বিষয়ে নাগরিকদের একটা দায়িত্ব রয়েছে, সচেতনতার ব্যাপার রয়েছে।

তথ্য বলছে, যাত্রীসেবার নামে রাজধানীর মহাসড়কগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ, ফিটনেসবিহীন প্রায় ৩০ হাজার যাত্রীবাহী লেগুনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার দ্বারাই এই লেগুনা হয়ে উঠতে পারে, রাজধানীর একটি নির্ভরযোগ্য যানবাহন।







Share:

No comments:

Post a Comment

ALL NEWS

Facebook

Powered by Blogger.
'; (function() { var dsq = document.createElement('script'); dsq.type = 'text/javascript'; dsq.async = true; dsq.src = '//' + disqus_shortname + '.disqus.com/embed.js'; (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(dsq); })();

Search This Blog

Blog Archive

Recent in Sports

Home Ads

Facebook

Ads

Random Posts

Recent

Popular

Blog Archive

Recent Posts

List

ADS