উত্তরা মাসকট প্লাজা এবং নর্থ টাওয়ার টাওয়ারের নিচে গড়ে ওঠেছে অবৈধ লেগুনা স্ট্যান্ড। একের পর এক লেগুনা ভিড় জমায় এ স্ট্যান্ডে। এলোমেলোভাবে এগুলো পার্ক করে, রাস্তার মাঝখানে নামানো হয় এবং মাঝখানে উঠানো হয় যাত্রীদেরকে। এতে চলাচলে সমস্যা হয় গাড়িগুলো এবং পথচারীদের। পথচারী রায়হান বলেন, সারা দিন এখানে লেগুনা ভিড় জমিয়ে একের পর এক যাত্রী উঠাতে থাকে। লেগুনার জন্য হাঁটতে পারি না। লেগুনাযাত্রী সুফিয়া বেগম বলেন, এ লেগুনাগুলোর জন্য পুরোটা রাস্তায় জট লেগে থাকে। সকালে বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় যানজটের কারণে অনেক দেরি হয়ে যায়। এখন মেট্রোতে যাওয়ার জন্য অনেকে এই পথটা বাছাই করে নিয়েছেন । এ রাস্তা দিয়ে বাস চলাচল করে মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত ।
লেগুনাগুলো রাস্তায় ভিড় করে না দাঁড়িয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ালে রাস্তায় এত যানজটের সৃষ্টি হতো না। এখানে দাঁড়ানোর অনুমতি আছে কি না, জানতে চাইলে লেগুনা চালক শফিক বলেন, আমরা এখানে সবসময় গাড়ি রাখি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্র্যাফিক পুলিশ বলেন, রাস্তাটিতে লেগুনা পার্ক করা অবৈধ। তবে যাত্রী নামানোর জন্য গাড়ি দাঁড় করার অনুমতি আছে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে রাখলে ওদের উঠিয়ে দেয়া হয়।
অবৈধ লেগুনা ছুটে চলে মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত। প্রতিদিন চলে শতাধিক লেগুনা। সরকার নিষিদ্ধ করলেও এই রুটে লেগুনা চালায় সিন্ডিকেট। যার নেই কোনো রসিদ বা টোকেন। এভাবে চালক এবং মালিকদের থেকে সিন্ডিকেটের মাসে আয় লাখ লাখ টাকা। পুলিশ প্রশাসন, সরকার দলীয় নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন মহলে এই টাকা ভাগ হয় বলে জানিয়েছেন লেগুনা মালিকরা।
চালক এবং লেগুনা মালিকদের অভিযোগ, দিনের আলোতে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয় না পুলিশ।
উত্তরা এলাকায় লেগুনা পরিবহনের লাইনম্যান পরিচয়ে চাঁদা আদায় করছিলেন আব্দুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে চাঁদাবাজির কথা কালের কণ্ঠের কাছে স্বীকারও করেছেন তিনি। লেগুনাপ্রতি ৩০ টাকা নিচ্ছেন এই সিন্ডিকেট সদস্য।
তবে আব্দুর রহমানের দাবি, ৩০ টাকা নয়, ১০ টাকা করে নিচ্ছেন তিনি।
কেন লেগুনা থেকে চাঁদা নিচ্ছেন? এমন প্রশ্নে আব্দুর রহমান সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন, ‘এই টাকা দিয়ে বউ-বাচ্চা নিয়ে সংসার চালাই। অসুস্থ মানুষ, পেটের দায়ে বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমে চাঁদা তুলছি।’ কার কথায় চাঁদা তুলছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পরশ (হাসানুজ্জামান পরশ) ভাইয়ের হয়েই কাজ করি।’
বেশির ভাগ পরিবহনের নেই কোনো রোড পারমিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। চাঁদা দিয়েই দীর্ঘদিন যাবৎ এ সড়কে চলাচল করছে এ সকল অবৈধ লেগুনা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ লেগুনাচালক ও হেলপার অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাদের কাছে নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। এ মহাসড়ক দিয়ে চলা অধিকাংশ লেগুনার অবস্থাও বেহাল। লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলো বছরের পর বছর চললেও দেখার যেন কেউ নেই। পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রতিনিয়তই একপ্রকার আয়েশেই চলাচল করে মহাসড়কে নিষিদ্ধঘোষিত লেগুনা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সড়কে দুই শতাধিক লেগুনা চলে ‘পরশ ও পলাশ সিন্ডিকেট’কে চাঁদা দিয়ে। সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হাসানুজ্জামান পরশ পরিচয় দেন লেগুনার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। চাঁদাবাজি করেই হীরাঝিল এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় একাধিক জমি, পাঁচ-সাতটি লেগুনাসহ মাত্র কয়েক বছরে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। বিভিন্ন পরিবহন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার হলেও হাসানুজ্জামান পরশের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি এখনো। পরশের হয়ে মোড়ে মোড়ে চাঁদা তোলে তার লোকজন।
শিমরাইল এলাকায় নিজেই থাকেন হাসানুজ্জামান পরশ। সেখানে 'চিটাগাং রোড লেগুনা মালিক সমিতি'র নামে আতিকুর রহমান আতিক মিয়াসহ পরশ সিন্ডিকেট প্রতিদিন দুই শতাধিক লেগুনা থেকে ৪৫০ টাকা করে তোলে। এতে দিনে প্রায় লাখ টাকা তুলে নেয় এই চক্র। এ ছাড়াও ওই এলাকায় আব্দুর রহমান, মনির হোসেন ও শহিদ মিয়া প্রতি গাড়ি থেকে নেন ৩০ টাকা। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ী এলাকায় চলে পলাশ মিয়ার সিন্ডিকেট। ওই এলাকায় তার হয়ে আরিফ মোল্লা, সাঈদ মিয়া, কাউসার মিয়া, অনিক হোসেন, শাহ আলম মিয়া, নয়ন মিয়াসহ কয়েকজন চাঁদাবাজ প্রতি লেগুনা থেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করেন। মোড়ে মোড়ে এই চাঁদাবাজদের টাকা দিতে হয় লেগুনাচালক এবং মালিকদের। মাসে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়া হয় বলে দাবি তাদের।
সিদ্ধিরগঞ্জ আজিবপুর বাগানবাড়ী এলাকায় নূরু মিয়ার ছেলে আতিকুর রহমান আতিক দীর্ঘদিন যাবৎ লেগুনা থেকে চাঁদা আদায় করে হয়েছেন বাড়ি ও গাড়ির মালিক। রয়েছে সাত-আটটি লেগুনা পরিবহন। প্রশাসনের ভয়ে মাঝে মাঝে এলাকা থেকে গাঢাকা দেন আতিক। তবে কিছুদিন পরেই ফেরেন সহাসড়কে চাঁদাবাজরূপে।
শিমরাইল এলাকায় চলাচলরত লেগুনাচালক বরকত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাধ্য হয়েই চাঁদা দিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। চাঁদা না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানিসহ গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়। লাইনে নতুন গাড়ি নামাতে হলে এককালীন হিসেবে চাঁদা দিতে হয় ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।’
সিন্ডিকেট প্রধান হাসানুজ্জামান পরশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কোনো চাঁদাবাজির সঙ্গে জাড়িত না। এই সড়কে আমার কয়েকটি লেগুনা রয়েছে। এ সকল লেগুনা থেকে ভাড়া উত্তোলন করে সংসার চালাই। সমিতির নামে যে টাকা ওঠাই তা থানা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, দলীয় নেতাকর্মীসহ সবাইকে দিতে হয়।’
শিমরাইল এলাকায় দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশের এএসআই আলাউদ্দিন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এক বছর যাবৎ শিমরাইল মোড়ে দায়িত্ব পালন করছি। পুরো সময় ধরে প্রতিদিনই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লেগুনা চলাচল করছে। এ বিষয়টি বড় স্যারদের নজরে আছে। তারাই ভালো বলতে পারবেন।’








No comments:
Post a Comment