বর্তমানে প্রায় সব সরকারি চাকরি হয় টাকার বিনিময়ে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সামান্য অংশ বাদ দিলে টাকা ছাড়া চাকরি জোটে না। দপ্তরি বা অফিস সহায়ক পদে চাকরি পেতেও লাগে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। কর্মকর্তা পর্যায়ের চাকরির দর ওঠে ২২ বা ২৫ লাখে। সরকার বছরে গড়ে ৫০ হাজার চাকরি দিতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলেন, কোন চাকরিতে কত টাকা ঘুষ লাগে তা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। সব চাকরিতে ঘুষ লাগছে বিষয়টি এমনও নয়। তবে ঘুষের যে ব্যাপকতা তাতে ধরেই নেওয়া যায় পিএসসির বাইরের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ চাকরিতেই ঘুষ লাগে।
স্থান-কাল ভেদে ঘুষের রেট ভিন্ন ভিন্ন হয়। জেলা পর্যায়ে অফিস সহায়কের চাকরি পেতে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। কিন্তু সচিবালয়ের ভেতর কোনো মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়কের চাকরির জন্য ২০ লাখ টাকাও দিতে হয়। পুলিশ, ট্যাক্স, কাস্টমসÑ এসব সেক্টরের চাকরির ঘুষের রেটের কোনো সীমা থাকে না। এসব বিষয় উল্লেখ করে একজন বিশ্লেষক জানান, ধরে নেওয়া হয় সরকারি চাকরি পেতে গড়ে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। ৫০ হাজার চাকরির মধ্যে পিএসসির আনুমানিক ২ হাজার বাদ দিলে থাকে ৪৮ হাজার। এর ৭৫ শতাংশ চাকরির সংখ্যা হচ্ছে ৩৬ হাজার। প্রতিটি চাকরির জন্য গড়ে ১৫ লাখ টাকা হারে ঘুষ দিতে হলে ৩৬ হাজার চাকরির জন্য ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়।
ছা-পোষা সংসার থেকে চাকরির ঘুষের টাকা জোগান দেওয়া আকাশ-কুসুম চিন্তার মতো। কোনোরকমে লেখাপড়া টেনে নিতে পারলেও চাকরির টাকার জোগান দিতে পারে না নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবার। ফলে যাদের টাকা আছে তারাই চাকরি পাচ্ছে। আর যাদের টাকা নেই, সেসব পরিবারের সন্তানরা চাকরির বাজারে অচ্ছুতই থেকে যাচ্ছে। এতে তেলে মাথায় তেল দেওয়া হচ্ছে, সমাজে নতুন করে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে স্কুলের দপ্তরি পদে নিয়োগে ঘুষের দর উঠেছে ৭ লাখ টাকা। উপজেলার মহেন্দ্রপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এ ঘটনা নিয়ে তদন্ত করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বগুড়ার শিবগঞ্জে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ১৪ লাখ টকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর তা নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার ঘটনা ঘটেছে। আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে সব সময়ের অস্থায়ী পদের জন্যও ৫ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়।
আপাতভাবে ওপরের প্রতিটি ঘটনাই আলাদা। কিন্তু এসব ঘটনার অন্তমিল রয়েছে। নিচের দিকের পদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়ার বিষয়টা কিছুটা প্রকাশ্যে এলেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন একটু ওপরের দিকের পদ বা কর্মকর্তা পর্যায়ের চাকরি প্রার্থীরা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, বছরে গড়ে ৫০ হাজার শূন্যপদ পূরণ করতে পারে সরকার। ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি চাকরি হয়েছে ৫১ হাজার ৯০৯ জনের। ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৫৫৩, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৮ হাজার ৮৮৭ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪০ হাজার ২৫৮ জনের চাকরি হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদবির ছাড়া বা ঘুষ ছাড়া চাকরি পাওয়া আর আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া সমান কথা।’
গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রতিবাদে খাদ্য অধিদপ্তরের সামনে সমাবেশ করেছিলেন ভুক্তভোগীরা। সেই সমাবেশে তারা প্রকাশ্যে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী উৎকোচ দিতে পারলে সংশ্লিষ্ট পদের যোগ্যতা না থাকলেও চাকরি পেতে অসুবিধা হয় না। উৎকোচের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা এবং নকল হোক আর আসল হোক, একটা সার্টিফিকেট থাকলেই হলো। সব নিয়োগেই ঘুষ লেনদেন এখন ওপেন সিক্রেট। স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্যের (এমপি) নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের ‘হিস্যা’ হাতিয়ে নেওয়ার পরই নিয়োগপত্র নিশ্চিত করা হয়। কোথাও নিয়োগবাণিজ্যের টাকা ভাগাভাগি করে নেন এমপি ও সরকারি কর্মকর্তারা। নিয়োগের ক্ষেত্রে টাকা আদায় ও বণ্টনে দলীয় লোকজন বা এমপি ভাগ না পেলেই বাধছে ঝামেলা। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলে বন্ধ করা হয় নিয়োগ প্রক্রিয়া। বিধি অনুযায়ী আবেদন-নিবেদন, লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, যাচাই-বাছাই ও মেধাকে কোনো পাত্তা দেওয়া হয় না। কে আগে টাকা পরিশোধ করেছে তার ভিত্তিতেই তৈরি হয় ‘মেরিট লিস্ট’।
ভূমি মন্ত্রণালয়ে কম্পিউটার অপারেটর কাম অফিস সহকারী পদে চাকরির জন্য প্রতিবেশী এক ব্যক্তিকে ১৩ লাখ ঘুষ দিয়েছেন রংপুর শহরের দখিগঞ্জ এলাকার সোহাগ মিয়া। টাকা নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যে নিয়োগপত্র ও যোগদানপত্র দেওয়া হয় তাকে। পরে ঢাকায় একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রেখে সোহাগকে বলা হয় চাকরিতে যোগদান হয়েছে। এখানে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তিন মাস প্রশিক্ষণ শেষে পদায়ন হবে। প্রশিক্ষণ চলাকালে তাকে বেতন হিসেবে দুই মাসে ২২ হাজার টাকা দেওয়া হয়। সঙ্গে বেতন, বিল, ভ্রমণভাতাসহ সরকারি দপ্তরের বেশ কিছু ফরমও দেওয়া হয় তাকে। পরে পদায়ন পেতে দেরি হওয়ায় খোঁজ নিয়ে সোহাগ জানতে পারেন সব ছিল সাজানো।
সোহাগ মিয়ার ঘটনাসহ আরও একাধিক কাহিনি জানার পর গত ২০ আগস্ট প্রতারক চক্রের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে সাবধান করে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় ভূমি মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত একটি প্রকল্পে নিয়োগ হচ্ছে মর্মে একটি ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এতে বিভিন্ন প্রতারক চক্র ভূমি মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাভুক্ত দপ্তর, সংস্থা ও প্রকল্পে চাকরি দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে এর আগেও ভূমি মন্ত্রণালয় অনেকবার সতর্ক করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এরপরও প্রতারক চক্র থামে না। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও একটা দায়িত্ব আছে। আমরা কোনো কিছু বাছবিচার না করে টাকা দিয়ে দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত দপ্তর বা সংস্থায় সব ধরনের নিয়োগ বিধিবিধান অনুসরণ করে স্বচ্ছতার সঙ্গে করা হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে বা অর্থের বিনিময়ে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত দপ্তর, সংস্থা থেকে কোনো পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি খ্যাতনামা দৈনিক পত্রিকায় এবং মন্ত্রণালয়ের ও দপ্তর সংস্থাগুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইটে যথানিয়মে প্রকাশ করা হয়। এরপরও যদি কেউ প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে, তাহলে ভূমি মন্ত্রণালয় কী করতে পারে।
এক প্রশ্নের জবাবে ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয়ের এ বিজ্ঞপ্তিতে চাকরি প্রার্থীরা যে কত অসহায় তা ফুটে উঠেছে। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘চাকরির পদ্ধতি আরও সহজ করা উচিত। এজন্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনকেও দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক এ অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনেরও সংস্কার দরকার। এ সাংবিধানিক সংস্থাটি যতটা কর্তৃত্ব চর্চা করা দরকার তা করছে না।’






No comments:
Post a Comment